চিন্তা করা যায়- আমরা এমন দেশে বাস করছি?

0
182

ড্রাইভারদের ৮ হাজার টাকা করে দেয়া হতো এক্সিডেন্ট প্রতি! এরপর ওই আ’হত রো’গীদের তার হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে টাকা নেয়া হতো।

চিন্তা করা যায়- আমরা এমন দেশে বাস করছি?

এছাড়া বিভিন্ন বড় বড় রাস্তার মোড়ে কিংবা স’রকারি হাসপাতালগুলোতে লোক রাখা হতো- যে কোনো রো’গী কিংবা তার স্বজনদের ভু’লিয়ে তার নিজের হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য। এতে অবশ্য আমি তেমন অবাক হইনি।
অবাক হয়েছি কাল একাত্তর টেলিভিশনের টক’শো দেখে। সেখানে দু’জন ডাক্তার উপস্থিত ছিলেন, তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো

-আপনারা কি এইসব বি’ষয় জানেন?

এরা বেশ হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছে-হ্যাঁ, সব’ই জানি। এইসব দেখে দেখে আমরা অভ্যস্ত। সিস্টেমের পরিবর্তন না হলে কিছু করার নেই!

এদের কথা বলার ধরণ দেখে মনে হলো এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। অথচ আমার চোখ কিনা কপালে উঠার জোগাড়!

আমি তাহলে কোথায় বাস করতাম! আমার কাছে কেন এই খবর এতো অবাক হবার মতো হয়ে আসলো?

যেই দেশে দিনে দুপুরে ইচ্ছে করে মানুষকে এক্সিডেন্ট করে রো’গী বানিয়ে নিজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়; যেই দেশে অন্য হাসপাতাল থেকে রো’গী কেনা-বেচা হয়; এরপর রো’গীদের জি’ম্মি করে অর্থ আদায় করা হয়; সেই দেশে মানুষের নিরাপত্তা আসলে কোথায়?

অথচ টেলিভিশনে আলোচকদের দেখে মনে হলো- এইসব তো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার!

এর মানে কি- আমরা সবাই ব্যাপারগুলো জানি, এরপরও কেউ কিছু বলছি না কিংবা করছি না?

অবশ্য আমরা সবাই তো ছুটছি যে করেই হোক “বড়লোক” হবার পেছনে।

আপনি মানুষ মে’রে অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন নাকি পা’চার করে; এই নিয়ে অবশ্য কোনো স’মস্যা নেই। মাঝে মাঝে হয়ত সাহেদ কিংবা এমন দুই একজনকে আমরা দেখতে পাই; কিন্তু পুরো সিস্টেমটাই তো এমন দাঁড়িয়ে গেছে।

এই দেশে সম্মান দেয়া হয় কেবল অর্থ-সম্পদ এবং ক্ষ’মতাবানদের।

সেবার দেশে গিয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসরের স’ঙ্গে দেখা করার জন্য গিয়েছি তার অফিসে। স’ঙ্গে আমার পু’লিশ অফিসার এক বন্ধুকে নিয়ে গিয়েছি। পরিচয় করিয়ে দেয়ার স’ঙ্গে স’ঙ্গে প্রফেসর ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে আমার ওই পু’লিশ অফিসার বন্ধুকে “সালাম” করেছে। সেই স’ঙ্গে পুরো সময় জুড়ে তার স’ঙ্গে’ই কথা বলেছে এবং “স্যার”, “স্যার” বলে সম্বোধ’ন করেছে! অথচ তার কাছে মূ’লত আমি গিয়েছিলাম। সে আমার দিকে ভালো করে তাকালও না!

এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা। দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিনা ছাত্রের ব’য়সী এক পু’লিশ অফিসারকে দাঁড়িয়ে সালাম করছে আর “স্যার”, “স্যার”, বলছে!

আমার ওই বন্ধু অবশ্য তার অফিস থেকে বের হবার স’ঙ্গে স’ঙ্গেই হাসতে হাসতে আমাকে বলেছিল- ‘দেখলি তো অবস্থা’টা’!

তো এই শিক্ষাই তো আমরা পাচ্ছি। যে করেই হোক অর্থের মালিক হতে হবে কিংবা ক্ষ’মতার।

আমার এক ছাত্র। সে অবশ্য বিদেশে থাকে। তো একদিন কথা প্রস’ঙ্গে সে আমাকে বলছিল – “এই শহরে গণ্য-মান্য ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা করা উচিত সবারই!”

আমি তাকে ফিরতি প্রশ্নে বললাম- ‘শ্রদ্ধা তো অবশ্য’ই যে কাউকে করা উচিত যদি করার মতো হয়। কিন্তু এই যে তুমি গণ্য-মান্য বলছ; তোমার চোখে কারা গণ্য-মান্য?’

সে এইবার উত্তরে বলেছে- ‘যাদের এখানে নিজেদের বাসা কিংবা ফ্ল্যাট আছে। গাড়ি-বাড়ি আছে কিংবা যারা এখানকার সিটিজেন!’

এই ছেলে আমার ছাত্র! আমি ওর কথা শুনে এতো অবাক হয়েছি, আমার এরপর রুচিতে বাঁধছিল ওর স’ঙ্গে কথা বলতে। এরপর মনে হলো- ছেলেটা আমার ছাত্র। তাকে অতি অবশ্য’ই আমার মতামত জানানো উচিত।

আমি তাকে বললাম- ‘তোমার কাছে মনে হচ্ছে যাদের টাকা আছে, গাড়ি-বাড়ি আছে তারাই সম্মানের পাত্র, তাই না?’
-হ্যাঁ।
-তো, তুমিও নিশ্চয় সেটাই চাও। যে করেই হোক অর্থ উপার্জন করে সম্মানিত হতে?
এই ছেলে এরপর আর কিছু বলেনি।

তো, এই সবই তো চলছে। আপনি দেশে থাকুন আর বিদেশে। আমরা এমন শিক্ষাই পেয়েছি। সমাজে যার টাকা আছে, গাড়ি-বাড়ি আছে সে হচ্ছে সম্মানিত। তাকে আমরা শ্রদ্ধার চোখে দেখি!

আমি আমার কথা বলি। আমার নিজের কোনো গাড়ি নেই, বাড়ি নেই। ব্যাংকে তেমন কোনো টাকা-পয়সাও নেই। আমি একদম’ই অতি সাধারণ একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অল্প-একটু গবে’ষণাও করার চেষ্টা করি। বেতন যা পাই, নিজের চলে যাচ্ছে ভালোভাবেই।

তো, এই সমাজে আমার মতো মানুষের কি দুই পয়সার মূ’ল্য আছে?

সোজা উত্তর হচ্ছে- না, নেই!

বলছি না, আমি সমাজের মানুষদের কাছ থেকে “মূ’ল্য’ চাই। আমার সেটার দরকার নেই। কারণ আমি এমন’ই। কিন্তু আমি নিশ্চিত, অনেক মানুষ’ই সেটা চায়। এক ধরনের স্বীকৃতি কিংবা মূ’ল্যায়ন চায় মানুষজন।

তো, আমাদের সমাজে কি এমন সাধারণ মানুষদের মূ’ল্যায়ন করা হয়?

অতি অবশ্য’ই করা হয় না। না আছে আমার অর্থ, না আছে আমার কোনো ক্ষ’মতা।

তো, তখন এই মানুষগুলো কি করে জানেন? তারা অন্য যে কোনো কিছু করেই হোক অর্থ উপার্জন করার চেষ্টা শুরু করে। কারণ তারা জানে, টাকা হলেই মানুষ তাদের মূ’ল্যায়ন করতে শুরু করবে। সেই সাথে ক্ষ’মতা।

এই যে এক ডাক্তার ম’হিলা কাল গ্রে’ফতার হলেন। তিনি তো ডাক্তার ছিলেন। তার তো চাকরি ছিল। তিনি কেন এরপরও এতো কিছুর পেছনে ছুটলেন?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- তিনি যদি একজন অতি সাধারণ ডাক্তার’ই থেকে যেতেন; এই যে আপনারা এই ম’হিলার সমালোচনা করছেন; সেই আপনারা কি তাকে দুই পয়সার মূ’ল্যায়ন করতে? আমাদের সমাজে কি সেটা করা হয়?

আমরা তো সঠিক মানুষকে মূ’ল্যায়ন করতেই শিখিনি। আমাদের দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পু’লিশ অফিসার দেখে “স্যার”, “স্যার” বলে দাঁড়িয়ে সালাম দিচ্ছেন। পাশেই বসে থাকা এই আমি, যে কিনা নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়; তার স’ঙ্গে এমনকি হাত’টা মেলানরও প্রয়োজন বোধ করছে না! আর আমার ওই ছাত্র? সে তো মনে করছে- সমাজে যার গাড়ি-বাড়ি আছে; সে’ই হচ্ছে গণ্য-মান্য, শ্রদ্ধার পাত্র!

তো, মানুষজন যে করেই হোক টাকার পেছনে ছুটবে এটাই স্বাভাবিক।

সেইদিন রাতে আমার এক অতি প্রিয়জন বলছিল- সে ছোট বেলা থেকে ভেবে এসেছে তার মামা’র মতো বড়লোক হতে হবে তাকে।

কারণ তার মামা একজন শিল্পপতি ছিলেন। অনেক অর্থ-সম্পদের মালিক ছিলেন।

অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে- সে তার চাচা কিংবা ফুপার মতো চাকরিজীবী হতে চায়নি কিংবা ডাক্তার বা অফিসার হতে চায়নি। যারা কিনা অনেক পড়াশুনা করে নিজ নিজ জায়গায় হয়ত কিছুটা হলেও সফল।

তো, কেন চায়নি?

কারণ সে বড় হতে হতে দেখেছে- তার আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী সবাই সম্মান দিচ্ছে কিংবা মূ’ল্যায়ন করছে তার মামা’কে। চাচা কিংবা ফুপা’কে না!

সুতরাং তার মনেও এটা গেঁথে গিয়েছে- আমাকে মামা’র মতো হতে হবে!

আপনি যেই পরিবেশে বড় হবেন; আপনার আশপাশে মানুষজন মিলিয়েই তো আপনি।

আমি-আপনি তো আর কেউ আকাশ থেকে পড়ে বড় হয়ে যাইনি!

এখন যারা সাহেদ কিংবা ডাক্তার ম’হিলা কিংবা অন্যদের সমালোচনা করছেন; দেখু’ন আপনি নিজে সেই সুযোগ পেলে হয়ত এদের চাইতেও খা’রাপ হতেন। হতেন’ই হতেন! এতে কোন ভু’ল নেই! জাস্ট কোনো ভু’ল নেই।

অথচ মহাআ’নন্দে সমালোচনা করে যাচ্ছি আমরা সবাই।

আমাদের তো সিস্টেমটাই এমন। যেই দেশে মানুষকে এক্সিডেন্ট করে রো’গী বানিয়ে এরপর নিজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়; সেটা আবার অন্যান্য ডাক্তাররা খুব হেসে হেসে বলছে- আমরা জানি এমন হয়! সেই দেশের মানুষজনদের সাহেদ কিংবা ডাক্তার ম’হিলার কর্মকাণ্ড দেখে যখন সমালোচনা করতে দেখি; তখন সত্যি’ই মনে হয়- আমরা কি সঠিক বি’ষয়ে সমালোচনা কিংবা আলোচনা করছি?

একটা গাছের গোড়ায় পচন ধরেছে। এখন আমরা যদি গাছটির আগা ছেটে দিয়ে ভাবতে থাকি গাছটি বেঁচে যাবে; তাহলে তো স’মস্যা। একদিন না একদিন গাছটি গোড়াসহ ভে’ঙে পড়বেই!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here