কি’শোরী-তরুণীদের যেভাবে ড্যান্সবারে ও দে’হব্যবসায় নামাতেন তারা

0
83

কি’শোরীটি পড়তেন নবম শ্রেণিতে। এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে তার স’ঙ্গে পরিচয় হয় দেশের খ্যাতিমান নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার ইভান শাহরিয়ার সোহাগের স’ঙ্গে। একপর্যায়ে তিনি দুবাইয়ের হোটেলে ভালো চাকরির লোভ দেখান ওই কি’শোরীকে।

এই টোপ গেলা মাত্রই ইভান শাহরিয়ার সোহাগ কি’শোরীকে পরিচয় করিয়ে দেন দুবাইয়ে না’রীপা’চারের ‘গডফাদার’ আজম খানের ভাই নাজিমের স’ঙ্গে। অনেকটা চোখের পলকে পাসপোর্ট-ভিসা-টিকেট তৈরি হয়ে যায় ওই কি’শোরীর। অনেক আশা নিয়ে প্লেনে চড়ে দুবাই পৌঁছেই বুঝতে পারেন, কতো বড় ভু’ল তিনি করে ফে’লেছেন!

কি’শোরীর স্থান হয় দুবাইয়ের সিটি টাওয়ার হোটেলের একটি বদ্ধ কক্ষে— যাতে কোনো জানালা ছিল না। ওই কি’শোরীর মতো আরও ২০ না’রী তখন ওই হোটেলে জায়গা পেয়েছিল তারই মতো জানালাবিহীন বদ্ধ কক্ষে।

সবগুলো মে’য়েরই দিন শুরু হতো রাত নয়টা থেকে। সিটি টাওয়ার হোটেলের বলরুমে ভোর চারটা পর্যন্ত তাদের নাচতে হতো আরবি, হিন্দি ও ইংরেজি গানের স’ঙ্গে। আবার বলরুমে আসা কোনো গেস্ট যদি এই মে’য়েদের কারও স’ঙ্গে রাত কা’টাতে চাইতেন,

তখনও তাদের স’ঙ্গে রুমে যেতে হতো। এজন্য দুবাই ক্লাবের সুপারভাইজার আলমগীর ২ হাজার ২০০ দিরহাম (বাংলাদেশি টাকায় ৫০ হাজার) নিতেন ‘খদ্দের’ থেকে। কোনো মে’য়ে রুমে যেতে না চাইলে আলমগীর কোম’রের বেল্ট ও শ’ক্ত লা’ঠি দিয়ে তাকে পে’টাতেন।

নবম শ্রেণীর ছাত্রী সেই কি’শোরীর ভাগ্য তবু ভালো। দুঃসহ দিন-রাত কা’টানোর পর চার মাস আগে দুবাইয়ে বাংলাদেশের কনস্যুলার জেনারেল অফিসের সহায়তা নিয়ে ব’ন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে সম্প্রতি ফিরে আসেন বাংলাদেশে। হয়তো তিনি যেদিন দুবাই থেকে ফিরে আসেন, সেদিনই হয়তো অন্য কোনো শি’কার ‘ভালো চাকরি’র আশায় দুবাইয়ের ফ্লাইটে চড়ে বসেছেন।

দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যে এই না’রীপা’চার ও যৌ’নচ’ক্রের তিন মূ’ল হোতাই চট্টগ্রামের। তিনজনই আপন ভাই। এদের মধ্যে দুবাই পু’লিশের দেওয়া ত’থ্য ধরে ঢাকা সিআইডি গত জুলাই মাসে গ্রে’প্তার করে

‘গডফাদার’ আজম খানকে। তার অন্য দুই ভাই নাজিম উদ্দিন ও এরশাদ এখনও দুবাইয়ে ‘যৌ’নব্যবসা’ চা’লিয়ে যাচ্ছেন। বছরের পর বছর বাংলাদেশ থেকে পাঠানো না’রীদের এই তিন ভাই মিলে দুবাইয়ের হোটেল ও ড্যান্স বারে যৌ’নকর্মে বা’ধ্য করতেন।

টাকার বিনিময়ে এই তিন ভাইয়ের প্রতিনিধি হয়ে বাংলাদেশে মে’য়ে সংগ্রহের কাজটি করতেন জাতীয় পুরস্কারপ্রা’প্ত নৃত্যশিল্পী ইভান শাহরিয়ার সোহাগের মতো আরও অনেকেই। দেশজুড়েই সংঘবদ্ধ এই চ’ক্র। দেশের বিভিন্ন নৃত্য সংগঠন ও ক্লাব থেকে তারা মে’য়ে সংগ্রহ করতেন। গায়েহলুদসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যারা পেশাদার হিসেবে নাচেন, তারাই ছিলেন এদের মূ’ল শি’কার। এছাড়া চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, সিলেটসহ বিভিন্ন জে’লা থেকেও নানা কৌশলে না’রী সংগ্রহ করা হতো।

জীবনের শুরুতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাসিন্দা আজম খানের পরিচিতি ছিল ছিঁচকে চোর হিসেবে। একসময় হয়ে ওঠেন থানার তালিকাভুক্ত স’ন্ত্রাসী। র‌্যা’ব ও পু’লিশের তাড়ায় একপর্যায়ে পা’লিয়ে চলে যান দুবাই। সেখানে গিয়ে ধীরে ধীরে তার ভাগ্য খুলতে শুরু করে। বাংলাদেশ থেকে দুবাইয়ে না’রী পা’চার করে সেখানে যৌ’নব্যবসার জাল বিছিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন রাতারাতি বিত্তশালী। দুবাইয়ে চার তারকাযুক্ত তিনটি ও তিন তারকাবিশিষ্ট একটি হোটেলের মালিক আজম খান।

তার মালিকানাধীন হোটেলগুলো হলো ফরচুন পার্ল হোটেল অ্যান্ড ড্যান্স ক্লাব, হোটেল রয়েল ফরচুন, হোটেল ফরচুন গ্র্যান্ড ও হোটেল সিটি টাওয়ার। বছর পাঁচেক আগে দুবাইয়ে আজম খানের হোটেল থেকে লাফিয়ে পড়ে এক না’রীর আত্মহ’ত্যার ঘ’টনায় তাকে আমিরাত থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর তিনি চলে যান ওমানে। সেখানেও আগে থেকেই তার না’রীপা’চারের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত ছিল।

না’রীপা’চার ও যৌ’নকর্মে বা’ধ্য করার এই নেটওয়ার্কে শুরু থেকেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন আজম খানের দুই আপন ভাই— নাজিম উদ্দিন ও এরশাদ। তিনজনই চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কেরি মুহুরী বাড়ির মাহবুবুল আলমের ছেলে। ফটিকছড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় আজম খানের বি’রুদ্ধে ছয়টি হ’ত্যা মা’মলাসহ ১৫টি মা’মলা রয়েছে।

পু’লিশ জানিয়েছে, বাংলাদেশে এই তিন ভাইয়ের প্রতিনিধিরা প্রথমে হোটেলে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ২০-২২ বছর ব’য়সী তরুণীদের সামনে টোপ ফেলতো। বিশ্বাস অর্জনের জন্য বেতন হিসেবে ২০-৩০ হাজার টাকা নগদ পরিশোধও করা হতো। এমনকি দুবাইয়ে যাওয়া-আসা বাবদ সব ধরনের খরচও দিত ওই দালালচ’ক্র। এভাবে গত অন্তত আট বছরে চাকরির লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশের কয়েকশত তরুণী-কি’শোরীকে দুবাইয়ে পা’চার করা হয়েছে। অনেক মে’য়েকে আবার পা’চার করা হয়েছে ওমানেও।

ঢাকার আ’দালতে না’রী পা’চারচ’ক্রের ‘গডফাদার’ আজম খান স্বী’কারোক্তিমূ’লক জবানব’ন্দিতে বলেছেন, চট্টগ্রামের মাহফুজ, লালবাগের স্বপন, আলামিন ওরফে ডায়মন্ড, বংশালের ময়না ও ময়মনসিংহের অনীক তাকে মে’য়ে সংগ্রহের কাজে সাহায্য করেছেন।

অন্যদিকে আজমের স’ঙ্গে গ্রে’প্তার হওয়া তার ভাই নাজিমের বন্ধু মো. ইয়াছিন ও নির্মল ড্যান্স একাডেমির নির্মল স’রকার তাদের দেওয়া জবানব’ন্দিতে আরও দুই ‘গডফাদারের’ নাম জানিয়েছেন। এরা হলেন ঢাকার বাড্ডার সজীব ও ময়মনসিংহের অনীক। দুবাইতে এ দুজনেরও ড্যান্স বার আছে। আজম খানের ড্যান্স বার ছাড়াও তারা সজীব ও অনীকের ড্যান্স বারের জন্যও না’রী সরবরাহ করেছেন। এ কাজে তাদের মাধ্যম ছিলেন নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার ইভান শাহরিয়ার সোহাগসহ বেশ কয়েকজন নৃত্যসংগঠক এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আরও কিছু ‘এজেন্ট’।

এদিকে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাতে না’রী পা’চারকারী চ’ক্রের স’ঙ্গে জ’ড়িত নৃত্যশিল্পী ইভান শাহরিয়ার সোহাগকে গ্রে’প্তার করেছে সিআইডি (ঢাকা মেট্রো উত্তর বিভাগ) কর্মকর্তারা। ‘ধ্যাততেরিকি’ সিনেমায় নৃত্য পরিচালনার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান সোহাগ। করপোরেট অনুষ্ঠানে নাচার জন্য সোহাগ ড্যান্স ট্রুপ নামে তার একটি দল আছে। এছাড়া ‘নৃত্যভূমি’ নামে আরও একটি নাচের দল রয়েছে তার।

পু’লিশ জানিয়েছে, দেশ থেকে না’রী সংগ্রহ করে পাঠানোর পাশাপাশি সোহাগ তার নাচের দল নিয়ে দুবাইয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন প্রায়ই। ফেরার সময় সেই দল কয়েকজন করে মে’য়েকে রেখে আসতেন কৌশলে।

এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির সেলিম নামের আরও একজনের মাধ্যমে আজম খান ও তার দুই ভাই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে না’রী সংগ্রহ করতেন। চট্টগ্রাম ছাড়াও ঢাকা, রাজশাহী ও সিলেট থেকে বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে না’রী সংগ্রহের কাজটি বিশেষ করে আজম খানের পক্ষে তদারকি করতেন সেলিমই। সংগ্রহ করা না’রীদের পাসপোর্ট তৈরি করে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও তারই ছিল। দুবাই থেকে এসব না’রীর ভিসাসহ যাবতীয় কাগজপত্র দেশে সেলিমের কাছেই পৌঁছাতেন আজম খান।

বিদেশে না’রী পা’চারের ঘ’টনায় গত ২ জুলাই লালবাগ থানায় একটি মা’মলা হয়েছে। এতে পা’চারকারী আজম খান, তার দুই ভাই নাজিম উদ্দিন ও এরশাদ ছাড়াও আল আমিন হোসেন ওরফে ডায়মন্ড, মো. স্বপন হোসেন, নির্মল দাস (এজেন্ট), আলমগীর (দুবাই ক্লাবের সুপারভাইজার), আমান (এজেন্ট) ও শুভকে (এজেন্ট) আ’সামি করা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here