এক অবিবা’হিত না’রীর ভাবনা

0
80

[‘ইয়া আবি, জাওয়্যিজনি’ আরবি ভাষায় রচিত বিখ্যাত বই। বাংলা অনুবাদ ‘আব্বু আমাকে বিয়ে দিয়ে দিন’। বইটির লেখক আবদুল মালিক আল-কাসিম। বিয়ে, পরিবার ও সু’খময় দাম্পত্য জীবনের র’হস্য তুলে ধরা হয়েছে এ বইয়ে। সে বই থেকে একটি কাহিনি সংক্ষি’প্ত ও পরিমার্জিত ভাষান্তর করেছেন তাজুল ইসলাম]

বাবার গৃহে আমি ছিলাম খুবই আদুরে মে’য়ে। আমার কোনো চাওয়াই অপূর্ণ থাকত না। পাঁচ ভাইয়ের একমাত্র বোন বলে আমার স্নেহ-ভালোবাসা ও আদর-যত্নে কোনো কমতি ছিল না। সবাই আমার প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখত। আমার সব আবদার পরিবারের সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিত। আমি গভীরভাবে পড়াশোনায় মনোযোগ দিলাম এবং মাধ্যমিক স্তরে উত্তীর্ণ হলাম।

একদিন মায়ের দেওয়া একটি সংবাদে প্রথমবারের মতো কাঁ’পুনি ধরল আমার হৃদয়ে। তিনি বলেন, অমুক তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। আমি আ’শ্চর্য হলাম, বির’ক্ত হলাম। একে একে অসংখ্য বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যা’খ্যান করলাম। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করলাম। এদিকে প্রস্তাব আসার এই ধারাও অব্যাহত থাকল।

আমি সর্বদা একই প্রশ্ন করতাম—ছেলের যোগ্যতা কী? তার মধ্যে কী কী গুণ আছে? বিচিত্র সব পেশার যুবক এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলেরা আমার পরিবারের কাছে সম্বন্ধ পাঠাত। একবার আবদুল্লাহ নামের অসাধারণ এক যুবক বিয়ের প্রস্তাব দিল। সে জ্ঞানে-গুণে অন্য অনেকের চেয়ে এগিয়ে ছিল।

তবু আমি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলাম। কারণ আমি সুন্দরী, আমি মেধাবী; আমার একটা অবস্থান আছে। পড়ালেখা শেষে যখন কর্মজীবনে পা রাখলাম, সম্বন্ধ আসার ধারা বেড়ে গেল। তবে এতে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেল। যারা প্রস্তাব নিয়ে আসছে, তাদের ব’য়স খানিকটা বেশি—ত্রিশের আশপাশে!

সময় গড়াতে লাগল। এরই মধ্যে এমন একটি প্রস্তাব এলো, যা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিল। এক ব্যক্তি প্রস্তাব নিয়ে আসে যে সে তার স্ত্রী’কে তা’লাক দিয়েছে এবং তার একটি স’ন্তান আছে। এমন প্রস্তাব পেয়ে প্রথমে একটা ধা’ক্কা খেলাম। পরক্ষণেই বললাম, বেচারা বোধ হয় আমার অবস্থা জানে না, আমি কে। তার জন্য আমার একধরনের করুণা হলো।

দিন যায়, সপ্তাহ গড়ায়, মাস ফুরায়; এদিকে আমার ব’য়সও বাড়তে থাকে। কিন্তু সেদিকে আমার কোনো খেয়াল নেই। আমি আমার কাজে মগ্ন। ব’য়সের স’ঙ্গে পাল্লা দিয়ে একদিকে আমার দৈহিক লাবণ্য ও কমনীয়তা কমতে থাকে, অন্যদিকে বাড়তে থাকে আমার কাজের চা’প ও দায়িত্বের পরিধি।

আমি সবার বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে থাকি আর আবদুল্লাহর মতো এক তরুণের প্রস্তাব পাওয়ার আশায় অধীর আ’গ্রহে প্রহর গুনতে থাকি। কিন্তু আমার আশার গুড়ে বালি! খবর নিয়ে জানলাম, আবদুল্লাহ এখন চার স’ন্তানের বাবা আর আমি এখনো কুমারী বুড়ি। আমার ব’য়স এখন ৩০ ছুঁই ছুঁই। ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে জীবন! এইতো আমার বান্ধবী ফাতিমা, সে এখন চার স’ন্তানের মা।

আরেক বান্ধবীর কোলজুড়ে চাঁদের মতো ফুটফুটে দুটি মে’য়ে। আরেক বান্ধবী স্বা’মীকে নিয়ে কী সু’খে দিন কা’টাচ্ছে! অথচ তাদের আর্থিক অবস্থা নিতান্তই সাধারণ। আর আমি…!

আমি নি’র্ঝ’ঞ্ঝাট আরামে দিনাতিপাত করছি। আসলে আমি আ’ত্মপ্র’বঞ্চ’নায় ভু’গছি; নিজের স’ঙ্গে মি’থ্যা বলছি। সত্যি কি আমি সু’খে আছি? জনতার ভিড়ে এক অদ্ভুত নির্জনতা আমাকে জেঁ’কে ধরেছে। এদিকে আমার চারপাশে বিচিত্র সব ফিতনা ও পরীক্ষা এসে ভিড় জমাচ্ছে, আমাকে গ্রা’স করে ফেলতে চাইছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাকে অ’শ্লীল ও নির্ল’জ্জ কাজ থেকে হিফাজত করেছেন। এরই মধ্যে আমার তীক্ষ মেধা ও কঠিন অধ্যবসায় কর্মক্ষেত্রে আমাকে পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের সর্বোচ্চ স্তরে। কিন্তু এই সফলতা আমার কাছে অর্থহীন মনে হয়।

একদিন আমি অফিস থেকে ফিরলাম। বাসায় ফিরে দেখি, মা আমার উদ্দেশে একটি চিরকুট লিখে আমার বালিশের ও’পর রেখে দিয়েছেন। তাতে লেখা, ‘মে’য়ে আমার, অমুক তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সে ভালো চাকরি করে, আর তার ব’য়সও কম। আশা করি তুমি সায় দেবে; যদিও তার অন্য এক স্ত্রী ও ছয়জন স’ন্তান রয়েছে। দিন কিন্তু চলে যাচ্ছে। বি’ষয়টি নিয়ে চিন্তা করে আমাকে জানাও।’

আমি চিরকুটটা গভীর মনোযোগে পড়লাম এবং রা’গে ফে’টে পড়লাম। আমি মাথার চুলের দিকে তাকালাম। মাঝে মাঝে সাদা হয়ে ওঠা চুলগুলো লুকাতে এরই মধ্যে আমি ক’লপ লাগাতে শুরু করেছি। ভাবতে ভাবতে কা’ন্নায় ভে’ঙে পড়লাম আমি। শেষ পর্যন্ত এমন একজন লোকও আমাকে প্রস্তাব দিল? আমার ধৈ’র্যের বাঁধ ভে’ঙে গেল। রে’গেমে’গে সেই সন্ধ্যায় আমি বাবার কাছে গেলাম। তাঁকে বললাম, কিভাবে আপনারা এমন একজন মানুষের প্রস্তাব গ্রহণ করলেন, যার ছয়টা স’ন্তান আছে? বাবার জবাব আমার অন্তরে ধা’রা’লো ছু’রির মতো বি’দ্ধ হলো।

তিনি বলেন, ‘কয়েক মাসে আমাদের কাছে এমন বিবা’হিতরা ছাড়া অন্য কেউ প্রস্তাব নিয়ে আসেনি। আমার ভ’য় হয়, কিছুদিন পর হয়তো এমন সময় আসবে, যখন প্রস্তাব আসাই বন্ধ হয়ে যাবে। মে’য়ে আমার, মুরব্বিরা একটা কথা বলতেন, মে’য়েরা গোলাপের মতো—ছিঁ’ড়তে দেরি করলে পাপড়িগুলো ক্রমে শুকিয়ে আসে। আমার মনে হয়, তুমিও সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছ। মে’য়ে, তোমার কাছে তো শত শত প্রস্তাব এসেছিল, তুমি এক এক করে সব প্র’ত্যা’খ্যা’ন করেছ। ও বেশি লম্বা, সে বেশি খাটো, ওর এই দো’ষ, অমুকের এই সম’স্যা। আর এখন? এমন সময় এসেছে, তুমি আর কাউকেই পাচ্ছ না!’

অতীত স্মৃ’তিগুলো আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আব্বু, আপনি যদি তখন জীবনের এই বাস্তবতা বোঝাতেন, আমি এখন আপনাকে তির’স্কা’র করতাম না। হায়, আপনি যদি এর জন্য আমাকে প্রহা’র করতেন, আমার এই পরিণতি হতো না। এসব বলতে বলতে আমি কা’ন্নায় ভে’ঙে পড়লাম।এখন আর কোনো যুবকই আমার কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসে না। না লম্বা, না খাটো; না ধ’নী, না গরিব—কেউ না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here