রাজধানীতে টাকার বিনিময়ে জমজমাট স্বা’মী বাণিজ্য

0
160

রাজধানীর কুড়িল মোড়ের এক ফুটপাতের খুদে দোকানদার রিনা খাতুনের স্বা’মী নেই। আরেক বিয়ে করে স্বা’মী চলে গেছে। কোথায় গেছে সেটাও তার জানা নেই। তবে এই পক্ষের তার একটা ছেলে রয়েছে। ছেলেটি মাদ্রাসার লাইনে লেখাপড়া করে।

কাকলী-বনানী মোড়ে তিনটি স’ন্তান নিয়ে ফুটপাতে কখনো পিঠা, কখনো মৌসুমি ফল, সঙ্গে চা-পান বিক্রি করে জীবন চালান সিবলী বেগম। ছেলেকে চা-পানের দোকান আলাদা করে দিতে ৭ হাজার টাকার ঋ’ণ দরকার তার।

একটি এনজিও থেকে ঋ’ণ পেতে স্বা’মী দরকার। এনজিওর লোকজন বলছে ঋ’ণ পেতে হলে স্বা’মী-স্ত্রী দুজনের ছবি লাগবে। মাস কয়েক আগে এনজিওর ঋ’ণ পেতে একজন স্বা’মী ভাড়া করেছিলেন তিনি।

ঋ’ণের টাকা তুলে তা থেকে ১ হাজার টাকা দিয়েছেন তাকে। মাত্র ১ হাজার টাকাতেই তার সঙ্গে স্বা’মী পরিচয়ে এনজিও অফিসে গিয়ে ছবি তুলে ঋ’ণ পেতে সহায়তা করেছেন আলাউদ্দি নামের এক লোক।

অনেককিছু ভাড়ার পাশাপাশি এখন রাজধানীতে ভাড়ায় মিলছে এসব স্বা’মীও! এ বাণিজ্যে তিন ধরনের কাজের জন্য স্বা’মী পরিচয়ে পু’রুষ ভাড়া করা হয় বলে জানা গেছে।

স্বা’মী হিসেবে ভাড়ায় খেটে নিজের সংসার চালাচ্ছেন এমন চাঞ্চল্যকর ত’থ্যও পাওয়া গেছে। দিনে ৩০০ টাকা থেকে মাসে ৮-১০ হাজার টাকায় ভাড়ায় স্বা’মী পাওয়া যায়। আবার একই পু’রুষ ভাড়ায় খাটেন একাধিক না’রীর স্বা’মী পরিচয়ে এমন ত’থ্যও পাওয়া গেছে।

ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে যৌ’নকর্মীদের আনাগোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ওইসব যৌ’নকর্মী এখন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফ্ল্যাট বাড়ি ভাড়া নিয়ে হাই লেবেলে দেহ ব্যবসা শুরু করেছে।

বাড়ি ভাড়া নিতে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বা’মী ছাড়া বাড়ির মালিক বাসা ভাড়া দিতে চান না। বাড়ি ভাড়া নেয়ার ওই প্রতিবন্ধকতার কথা চিন্তা করে যৌ’নকর্মীরা তাদের পূর্বপরিচিত কোনো পু’রুষকে স্বা’মী হিসেবে ভাড়া করেন।

বাড়ি ভাড়া করার সময় সঙ্গে থাকেন ভাড়াটে স্বা’মী। দেখা গেছে, বাড়ি ভাড়া নেয়ার সময় বাড়ির মালিককে বলা হয় স্বা’মী নিয়মিত ঢাকায় থাকে না, বাইরের কোনো জে’লায় চাকরি বা ব্যবসা করে।

একই সঙ্গে বলা হয়, বাসায় নিয়মিত থাকবে তার স্ত্রী ও দুই বা তিন বোন। ওই বোনদের থাকার কথা বলে জায়েজ করে নেয়া হয় আরো দুই-তিনজন যৌ’নকর্মীকে। এভাবেই রাজধানীজুড়ে ফ্ল্যাট বাড়িগুলোতে চলছে যৌ’নবাণিজ্য।

বাড্ডার পলা’শ (ছদ্মনাম) জামালপুর থেকে অভাবের তাড়নায় ঢাকায় আসেন। এসএসসিও পাস নয়, তাই কোনো চাকরি দিতে চাচ্ছেন না কেউ। এরই মধ্যে দেখা মিলে ছি’নতাইকারী আজুলের সঙ্গে।

নিরুপায় হয়ে তার সঙ্গে যোগ দেয় ফার্মগেট এলাকায় ছি’নতাইয়ের কাজে। পরিবর্তন করে ফে’লে নিজের বংশ-পরিচয়ও। এরই মধ্যে পরিচয় হয় স্বা’মী পরিত্যক্তা রুপার সঙ্গে। তখন তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরির পাশাপাশি যৌ’ন ব্যবসায় লি’প্ত ছিলেন।

সি’দ্ধান্ত হয় স্বা’মী-স্ত্রী পরিচয়ে দুজন রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় ও শনির আখড়ায় বসবাস করবেন। এর পরই বিউটি পার্লার ব্যবসার আড়ালে রুপা শুরু করে জো’রালো যৌ’নব্যবসা।

এমন হাজার হাজার বিভিন্ন পরিকল্পনায় এ ব্যবসা চলছে। এ ছাড়াও, সোহান রাজধানীর শান্তিনগর, বাড্ডা, ফার্মগেট এলাকাসহ ৮-৯টি স্থানে যৌ’নকর্মীদের স্বা’মী পরিচয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে নিজে কামায় মোটা অঙ্কের টাকা। আর মাঝেমধ্যে খদ্দের জোগাড় করে দিলে তার কমিশন তো আছেই।

রাজধানীতে তিন ধরনের কাজের জন্য ম’হিলাদের স্বা’মী পরিচয়ে পু’রুষ ভাড়া করার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা গেছে। বিশেষ করে যৌ’নব্যবসার সঙ্গে জ’ড়িত না’রীরা বাসা ভাড়া নেয়ার সময়, স্বা’মী হিসেবে লোক ভাড়া করে বাড়ির মালিককে দেখিয়ে থাকেন তারা। এনজিওসহ বেশকিছু মাল্টিপারপাস কোম্পানি থেকে ক্ষুদ্রঋ’ণ নেয়ার শর্ত হিসেবে স্বা’মীর পরিচয় ও বউ পরিচয় দেয়া হয়।

এছাড়া, সম্প্রতি পাসপোর্ট অফিসে কোনো ম’হিলা স্বা’মী ছাড়া একা গেলে তাকে স্বা’মীর উপস্থিতি দেখানোর প্রয়োজনে স্বা’মী ভাড়া করে আবার স্বা’মী নিয়ে আসার ঝামেলা থেকে মুক্ত হতে হয়।

অনুসন্ধানে একই ব্যক্তির তিন-চারটে ফ্ল্যাট বাড়িতে স্বা’মীর পরিচয়ে ভাড়া খাটার বি’ষয়টি জানা গেছে। অপরপক্ষে ভাড়াকৃত স্ত্রীরাও ৪-৫ জায়গায় বাসা ভাড়া নেয়।

এমনই একজন সালাউদ্দিন। যে কিনা ছয় না’রীর স্বা’মী হিসেবে ভাড়া খাটেন। ভাড়া খাটার শর্ত হচ্ছে সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন স্বা’মী পরিচয়ে বাসায় অবস্থান করতে হবে, আর বাসার বাজারও করে দিতে হবে। বাসায় অবস্থান করা ও বাজার করার শর্ত দেয়ার মানে হচ্ছে যাতে আশপাশের লোকজন কোনো প্রকার স’ন্দেহ না করেন।

এদিকে, নার্গিস নামের এক মেয়ের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তিনি বায়িং হাউজের কাজ করেন গ্রামের বাড়িতে বাবা-মাকে সেটি বলেছেন। কিন্তু আসলেই তিনি বায়িং হাউজের নামে যৌ’ন ব্যবসা করেন।

একটি ফ্ল্যাটে প্রতিদিন চাকরির কথা বলে বাসা থেকে বের হন এরপর কোনোদিন বাসায় ফেরেন আবার কোনো সময় ফেরেন না।

জামালপুরের মধ্যবয়সী পু’রুষ সালাউদ্দিন ও শেরপুরে সুমন হোসেন প্রায় এক যুগ আগে ঢাকায় এসে মিরপুর এলাকায় পান-সিগারেটের ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে জড়িয়ে যান এক স’ন্ত্রাসী চ’ক্রের সঙ্গে। ধরা পড়ে জে’লও খাটেন দেড় বছর। জে’ল থেকে বেরুনোর পর পরিচয় হয় এক ম’হিলার সঙ্গে।

সেই থেকে ভাড়ায় স্বা’মীবাণিজ্য শুরু সালাউদ্দিনের। এখন রাজধানীর মিরপুর, বাড্ডা ও গাবতলী এলাকায় ছয়টি বাসায় ছয় না’রীর ভাড়াটে স্বা’মী তিনি। ভাড়া পান ৩০-৪০ হাজার টাকা। কোনো মাসে বেশি পান আবার কোনো মাসে কিছুটা কমও পান এমনটাই জানান সালাউদ্দিন।

সালাউদ্দিন নিজের স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে ভাড়ায় থাকেন মিরপুরের কালসী এলাকায়। ভাড়ায় স্বা’মী খাটাই এখন তার একমাত্র পেশা বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাম্প্রতিককালে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্টের জন্য ছবি তুলতে অফিসে যেতে হয়। অজ্ঞতাপ্রসূত কোনো না’রী একা পাসপোর্টের ছবি তুলতে গেলে তাকে স্বা’মী সঙ্গে রাখার কথা বলা হয়। সেই ক্ষেত্রে ম’হিলা পাসপোর্ট প্রত্যাশীকে সময় ব্যয় করে আরেকদিন আসতে হয় অথবা অন্য একদিন যেতে হয়।

ম’হিলারা ফিরে যাওয়ার সময় এখানকার কিছু দালাল সুকৌশলে ম’হিলাদের প্রস্তাব দেন, টাকা-পয়সা খরচ করে আবার আসবেন। তারচেয়ে মাত্র ৫০০ টাকা খরচ করেন। আমি একজন লোক দিচ্ছি, উনি আপনার সঙ্গে যাবেন এবং মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য উনাকে স্বা’মী পরিচয় দেবেন। ছবিটা তোলা হলে চলে যাবেন।

এদিকে, স্বা’মী বাণিজ্য এগিয়ে আছে ভাষানটেক, কুড়িল বিশ্বরোড এলাকা, বাড্ডা, ভাটারা, সবুজবাগ, গাবতলী, সায়দাবাদ, সদরঘাট সহ রাজধানীর বিভিন্ন শেষ সিমানা এলাকাতেই বেশিরভাগ স্বা’মী-স্ত্রী বাণিজ্য চলে।

জানা গেছে, রাজধানীতে বিভিন্ন ক্ষুদে ব্যবসার সঙ্গে জ’ড়িত বেশিরভাগ বস্তিবাসী বা ভাসমান না’রীরা উদয়-অস্ত পরিশ্রম করে স’ন্তানদের নিয়ে জীবন ধারণ করছেন। তাদের বেশির ভাগই স্বা’মী পরিত্যক্তা। ব্যবসা পরিচালনা বা সম্প্রসারণের কারণে কখনো কখনো এদের ক্ষুদ্রঋ’ণের প্রয়োজন হয়।

কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এনজিওগুলো বা নগরীতে সুদের ব্যবসা করে এমন সংস্থাগুলো ক্ষুদ্রঋ’ণ দেয়ার ক্ষেত্রে স্বা’মী-স্ত্রী দুজনের ছবি ও নাম ব্যবহার করে এবং দুজনকেই ঋ’ণের দায়ে আবদ্ধ রাখেন।

এমন ব্যবসার জন্য বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন কড়াইল বস্তিতে অনেকে মা’দক ও যৌ’ন ব্যবসায়ীরা। এ এলাকার স্থানীয় ১৯ নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ নেতা গনি মিয়াকে যৌ’ন অভিযোগের কারণে এক প’তিতা তার নামে মা’মলা করেন। এরপর পু’লিশ সজাগ থাকায় বেলতলা বস্তিতে এমন ঘ’টনা এখন আর নাই।

তবে কড়াইল বস্তির বিভিন্ন স্থানে এ ব্যবসা চলছে। ওই প’তিতা এভাবেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষকে ফাঁ’সিয়ে দেয়। এবং পরবর্তীতে প’তিতা মোটা অঙ্কের টাকার দাবি করে থাকে।

বর্তমান রাজধানীতে স্বা’মী বাণিজ্য চলে বনশ্রী গুলশান বনানী ধানমন্ডি নতুন বাজার বাড্ডা কুড়িল বিশ্বরোড, খিলক্ষেত, খিলগাঁও বাসাবো রাজধানীর বেশ কয়েকটি জায়গায় স্বা’মী স্ত্রীর ভাড়ার এই বাণিজ্য চলে।

এনজিওগুলোর এ নিয়মের কারণে স্বা’মী পরিত্যক্তাদের ক্ষুদ্রঋ’ণ পাওয়ার সুযোগ থাকে না। সে ক্ষেত্রে বা’ধ্য হয়ে পরিচিত এবং ভালো স’ম্পর্ক আছে এমন কাউকে স্বা’মী হিসেবে ভাড়া করে সংস্থাগুলো থেকে ব্যবসার ঋ’ণ পান ম’হিলারা। বিনিময়ে ভাড়াটে স্বা’মীকে ধরিয়ে দিতে হয় নগদ কিছু টাকা।

আবার জানা গেছে, অনেকে কেবল ভালো স’ম্পর্কের কারণে বিনা টাকায় ম’হিলাদের ঋ’ণ পেতে সহায়তা করেন তবে বিনিময় অন্য কিছু।

ডি’বি পু’লিশের এক কর্মকতা জানান, আমাদের দেশের রাজধানী ঢাকা। এখানে বসবাসের অন্যতম জায়গা। লক্ষ লক্ষ লোক এ শহরে বসবাস করে। এতো লোকের মাঝে যারা এসব কাজ করে তাদের বি’রুদ্ধে আমরা আইনত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি। তবে যদি কেউ গো’পনে এসব কাজ করে তাহলে তাদের শনাক্ত করে আমরা আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করব।

ডিএমপি হেড কোয়াটার্সের এক অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, এসব ব্যবসা ও বিভিন্ন অ’পরাধ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এক হিসেবে নেই বললেই চলে।

তার কারণ হলো এসব অ’পরাধীদের ধরতে আমাদের পু’লিশ সদস্যরা এটি দ’মনের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছে। তবে বতর্মানে যদি কেউ চু’রি করে এসব অ’পরাধের সঙ্গে যুক্ত হয় তবে তাদের বি’রুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেয়া হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here